দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব যেন নীরব এক সংকটে রূপ নিয়েছে। এক দিনের ব্যবধানে সর্বোচ্চ ১৭ জনের মৃত্যুর খবর নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে জনস্বাস্থ্য মহলে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে ২ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১১—যার মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু ৫২ জন এবং উপসর্গসহ মৃত্যু ২৫৯ জন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়—এটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা, প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের একটি কঠিন পরীক্ষা।
সংক্রমণের বিস্তার: ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় হাম চলতি বছরের জানুয়ারিতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে প্রথম হাম শনাক্ত হলেও শুরুতে বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি। তবে মার্চের মাঝামাঝি থেকে রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে।
২৪ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় (প্রায় ৯১%) হাম ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৭৯ শতাংশই ৫ বছরের নিচের শিশু—যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
টিকাদান কর্মসূচি: দেরিতে শুরু, প্রশ্নে কার্যকারিতা
সরকার ৫ এপ্রিল ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম শুরু করে। পরে ১২ এপ্রিল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ কয়েকটি শহরে এবং ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে এই কার্যক্রম বিস্তৃত করা হয়। ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের এই টিকা কার্যক্রম চলবে মে মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন—সংক্রমণ যখন ইতোমধ্যে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, তখন এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হচ্ছে?
হাসপাতাল বাস্তবতা: দেরিতে আসছে রোগী, বাড়ছে জটিলতা
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. মাহবুবুল হক জানান,
হামের জন্য নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিউমোনিয়াসহ জটিলতা তৈরি হওয়ার পরই রোগীদের হাসপাতালে আনা হচ্ছে। ফলে লাইফ সাপোর্ট দিয়েও অনেক শিশুকে বাঁচানো যাচ্ছে না। রংপুর ও বান্দরবানের সাম্প্রতিক দুই শিশুমৃত্যুর ঘটনা এই বাস্তবতাকেই সামনে আনে। স্থানীয় পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসার অভাব এবং সময়মতো রেফার না করার অভিযোগও উঠছে।
তথ্য ঘাটতি: অজানা রয়ে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বিশ্লেষণে প্রয়োজন বিস্তারিত তথ্য—
মৃত শিশুদের বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যান
হাসপাতালে আসতে বিলম্বের কারণ
কী ধরনের জটিলতা ছিল
চিকিৎসা ব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না
কিন্তু এসব তথ্য এখনো প্রকাশ করছে না স্বাস্থ্য বিভাগ। ফলে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে।
প্রশ্নের মুখে স্বাস্থ্য বিভাগ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, এসব তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের দায়িত্ব রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার। তবে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট—যা সংকট মোকাবিলায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সামনে কী?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন—
দ্রুত ও বিস্তৃত টিকাদান
কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি
হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো
স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ
হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ না নিলে এটি প্রাণঘাতী রূপ নেয়—যার নির্মম উদাহরণ এখন বাংলাদেশের বাস্তবতা।
0 Comments