মা ইলিশ সংরক্ষণে পদ্মা-মেঘনাসহ দেশের ছয়টি অভয়াশ্রমে ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মধ্যরাতে। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও নদীতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন চাঁদপুরের অর্ধলক্ষাধিক জেলে। নৌকা মেরামত, জাল প্রস্তুত আর ইলিশ ধরার স্বপ্ন নিয়ে নতুন করে আশায় বুক বাঁধছেন তাঁরা।
জেলেদের প্রত্যাশা, নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়বে। এতে দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট কাটবে, ফিরবে সংসারে স্বস্তি। তবে মাছের কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন না হলে নৌকা, জাল ও অন্যান্য সরঞ্জামের পেছনে করা বিনিয়োগ নিয়ে লোকসানের আশঙ্কাও রয়েছে তাঁদের।
মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী গত ২২ দিন নদীতে মাছ ধরা বন্ধ ছিল। এ সময় চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীর প্রায় ৭০ কিলোমিটার এলাকায় ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয়সহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছিল।
নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও মৎস্য বিভাগের সমন্বয়ে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে পাঁচ শতাধিক জেলেকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া বিপুল পরিমাণ মা ইলিশ, মাছ ধরার নৌকা ও অবৈধ কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়েছে।
চাঁদপুর নৌপুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা চলাকালে ১০৫টি মৎস্য মামলা করা হয়েছে। এ সময় ১ হাজার ৩০০ কেজি মা ইলিশ জব্দের পাশাপাশি শতাধিক জেলে ও নৌকা আটক এবং বিপুল পরিমাণ কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়।
নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন কষ্টে কেটেছে জেলেদের
নিষেধাজ্ঞার সময় নদীতে মাছ ধরতে না পারায় অনেক জেলে পরিবারকে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। সরকারি সহায়তা পেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম বলে অভিযোগ তাঁদের।
জেলেরা জানান, একটি নৌকা, জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম প্রস্তুত বা মেরামত করতে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। তাই নদীতে নেমে প্রত্যাশা অনুযায়ী ইলিশ না পেলে বড় ধরনের লোকসানে পড়তে পারেন তাঁরা।
জেলেদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার সময় যে পরিমাণ চাল দেওয়া হয়, তা দিয়ে পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো কঠিন। পাশাপাশি অভিযানের সময় কিছু নৌপুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে অসাধু জেলেদের নদীতে মাছ ধরার সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন তাঁরা। এ কারণে অভিযান পুরোপুরি সফল হয়নি বলে দাবি তাঁদের।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চাঁদপুর নৌ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আজমগীর হোসাইন। তিনি বলেন, যারা মাছ শিকারে ব্যর্থ হয়ে বারবার নদীতে নামার চেষ্টা করেন এবং নিয়ম মানেন না, তাঁরাই মূলত অপপ্রচার ও গুজব ছড়াচ্ছেন। নৌপুলিশের দাবি, এবারের অভিযান সফল হয়েছে।
চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামও এবারের অভিযান সফল হয়েছে বলে দাবি করেছেন।
ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের তাগিদ
এদিকে নদীতে ছোট আকারের ইলিশের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জেলা মৎস্য বিভাগ। ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন ধরে রাখতে নদীদূষণ রোধ, ক্ষতিকর ‘সাকার ফিশ’-এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণ এবং মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সুরক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
মা ইলিশ রক্ষায় গঠিত জেলা টাস্কফোর্সের পাশাপাশি নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, নৌপুলিশ ও মৎস্য বিভাগের সদস্যরা যৌথভাবে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে কাজ করেছেন। অভিযানে আটক জেলেদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে কয়েক লাখ মিটার কারেন্ট জাল ও মাছ ধরার নৌকা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু নির্দিষ্ট সময়ের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়। সারা বছর নদীর অভয়াশ্রম রক্ষা, অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধ, জাটকা নিধন প্রতিরোধ এবং নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার সময় প্রকৃত জেলেদের জন্য সরকারি সহায়তা আরও পর্যাপ্ত ও কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। এতে জেলেরা আর্থিক সংকটের কারণে নিষেধাজ্ঞা ভাঙতে নিরুৎসাহিত হবেন এবং ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
0 মন্তব্য